বৈশ্বিক পণ্যবাজারে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) মূল্যবান ধাতুগুলোর দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এ সময় স্বর্ণ, রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামে রেকর্ড উত্থান দেখা গেছে। অন্যদিকে এ নয় মাসে জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের দরপতন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বছরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মন্দার তথ্য এবং অনিশ্চিত আবহাওয়ার প্রভাবে পণ্যমূল্যের দামে এমন ওঠানামা দেখা গেছে। বাণিজ্যিক শুল্ক, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা সব মিলিয়ে বাজারে অস্থিতিশীলতা বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৪৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কমানোর প্রত্যাশা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বমুখী ক্রয় এবং মার্কিন সরকারের অচলাবস্থার (শাটডাউন) কারণে স্বর্ণ খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার কেসিএম ট্রেড গ্লোবালের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ‘ফেডের কম সুদহার এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রভাবে স্বর্ণের দাম রেকর্ড সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। এ প্রবণতার কারণে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে।’
নটশেল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মার্ক এলিস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, মার্কিন শুল্কনীতির কারণে রফতানিকারক দেশগুলো নতুন বাজার খুঁজছে। এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমছে। ফলে স্বর্ণ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, যার প্রভাব পড়ছে দামে।
ইউবিএসের কৌশলবিদ জেরি ফাওলার রয়টার্সকে বলেন, ‘খুচরা বিনিয়োগকারীদের বাড়তি চাহিদাও স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলছে।’
এদিকে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় তার প্রভাব পড়েছে রুপার বাজারে। চলতি বছরের শুরু থেকে গত মাস পর্যন্ত ধাতুটির দাম বেড়েছে ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রুপা খাতে বিনিয়োগ চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর প্রযুক্তিতে রুপার ব্যবহার বৃদ্ধি দামে প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়া মূল্যবান ধাতুর মধ্যে সবচেয়ে বড় উত্থান দেখা গেছে প্লাটিনামের বাজারে। এ সময় পণ্যটির দাম বেড়েছে ৭৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি-রফতানিতে আরোপিত কর নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং ইলোন মাস্ক ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব বাজারে প্রভাব ফেলেছে। প্যালাডিয়ামের দামও ৩৮ শতাংশ বেড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন আমদানি শুল্কের প্রতিফলন।
চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তামার দাম ২১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে পাউন্ডপ্রতি ৫ ডলার ৯২ সেন্টের রেকর্ড ছুঁয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার গ্রাসবার্গ খনিতে দুর্ঘটনায় উত্তোলন ব্যাহত হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের তামা আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণার প্রভাব পড়েছে বাজারে। এছাড়া চীনের অব্যাহত চাহিদাও দামকে ঊর্ধ্বমুখী রেখেছে।
অন্যদিকে জ্বালানি পণ্যের বাজারে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের মজুদ বেড়ে যাওয়ায় এবং ওপেক প্লাসের উত্তোলন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রভাবে ব্রেন্টের (অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ) দাম ১১ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও কমেছে ৯ শতাংশ।
কৃষিপণ্যেও উল্লেখযোগ্য দরপতন দেখা দিয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী উৎপাদনের কারণে এ সময় গমের দাম কমেছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া ভুট্টা ও সয়াবিনের দাম দরপতন হয়েছে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪ ও দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে চালের দাম ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে।
এ সময় চিনির দাম কমেছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। তুলা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কোকোর দাম প্রায় ৪২ শতাংশ কমে গেছে।